দেশে এমন জানাজা আগে দেখেনি কেউ
দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ও মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নির্বাচিত নারী সরকারপ্রধান বেগম খালেদা জিয়া–এর নামাজে জানাজায় ইতিহাসের বিরল দৃশ্যের সাক্ষী হলো বাংলাদেশ। এই জানাজায় ‘জনসমুদ্র’ শব্দটিও যেন বিশালতার কাছে হার মেনেছে। যেদিকে চোখ যায়, শুধু মানুষ আর মানুষ। লাখো কণ্ঠে কান্নাজড়িত দোয়া আর আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে আকাশ-বাতাস।
বুধবার বিকেল ৩টায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা ও মানিক মিয়া এভিনিউয়ে জানাজা শুরু হলে রাজধানীর আশপাশের সড়কগুলো কার্যত অচল হয়ে পড়ে। মানিক মিয়া এভিনিউ ছাড়িয়ে উত্তরে জাহাঙ্গীর গেট, পশ্চিমে মিরপুর রোড এবং পূর্বে ফার্মগেট পেরিয়ে কারওয়ান বাজার, বাংলামোটর ও মগবাজার পর্যন্ত জনস্রোত ছড়িয়ে পড়ে। মাইকের শব্দ যতদূর পৌঁছেছে, মানুষ ততদূর কাতারবন্দি হয়ে দাঁড়িয়ে থেকেছেন।
দল-মত নির্বিশেষে শোকার্ত মানুষের এই ঢল প্রমাণ করে, রাজনীতির ‘আপসহীন নেত্রী’ বেগম খালেদা জিয়া মানুষের হৃদয়ে কতটা গভীর স্থান করে নিয়েছিলেন। প্রবীণ রাজনৈতিক বিশ্লেষক থেকে সাধারণ মানুষ—সবাই একবাক্যে বলেছেন, দেশে এমন জানাজা আগে কেউ দেখেনি।
পুরান ঢাকার সত্তরোর্ধ্ব ব্যবসায়ী হাজী আবদুল লতিফ বলেন, ১৯৮১ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান–এর জানাজা দেখেছিলেন তিনি। তাঁর ভাষায়, চার দশকের বেশি সময় পর আবার ইতিহাসের সেই দৃশ্য যেন ফিরে এলো। তিনি বলেন, এমন ভালোবাসা জোর করে আদায় করা যায় না, এটি আল্লাহর দান।
জানাজায় উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। চাকরিজীবী, শিক্ষার্থী, রিকশাচালকসহ সর্বস্তরের মানুষের উপস্থিতিতে সংসদ ভবনের আশপাশের গাছ, ফুটপাত এমনকি নিকটবর্তী ভবনের ছাদও লোকে লোকারণ্য হয়ে ওঠে। জানাজার আগে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানের কান্নাবিজড়িত বক্তব্য এবং পরে তারেক রহমান–এর মায়ের জন্য দোয়া চাওয়ার মুহূর্তে পুরো এলাকা পিনপতন নীরবতায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে।
বেগম খালেদা জিয়ার শেষ বিদায়ে উপস্থিত ছিলেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধি ও কূটনীতিকরা। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, ভারত, পাকিস্তান, জাপান, সৌদি আরবসহ ঢাকাস্থ ৩২টি দেশের প্রতিনিধিরা জানাজায় অংশ নেন। নির্ধারিত স্থানে দাঁড়িয়ে তাঁরা বাংলাদেশের মানুষের এই আবেগঘন বিদায় প্রত্যক্ষ করেন।
জানাজায় নারীদের উপস্থিতিও ছিল লক্ষণীয়। মূল অংশে প্রবেশ সীমিত থাকলেও নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে হাজারো নারী অশ্রুসজল চোখে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রীকে শেষ বিদায় জানান। অনেকের হাতে ছিল কালো ব্যাজ, মুখে ছিল গভীর শোকের ছাপ।
বিশ্লেষকদের মতে, বেগম খালেদা জিয়ার এই জানাজা কেবল একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা ছিল না। এটি ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। দীর্ঘ রোগভোগ, কারাবাস এবং নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়েও ক্ষমতার বাইরে থেকে একজন নেতা কীভাবে গণমানুষের হৃদয়ে অমর হয়ে থাকতে পারেন—এই জানাজা তারই সাক্ষ্য হয়ে রইল।


