নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিল আবেদন মঞ্জুর করে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীকে বৈধ ঘোষণা করেছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। এতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে আয়োজনের ক্ষেত্রে আর কোনো আইনি বাধা থাকল না। দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এটিকে এক গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক রায় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (২০ নভেম্বর) সকাল ৯টা ৪০ মিনিটে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে সাত সদস্যের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন। বেঞ্চের অন্য বিচারপতিরা ছিলেন— বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম, বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, বিচারপতি মো. রেজাউল হক, বিচারপতি এস এম ইমদাদুল হক, বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান এবং বিচারপতি ফারাহ মাহবুব।
এই মামলায় গত ২১, ২২, ২৩, ২৮, ২৯ অক্টোবর এবং ২, ৪, ৫, ৬ ও ১১ নভেম্বর শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানিতে ড. বদিউল আলম মজুমদারসহ পাঁচজনের পক্ষে আইনজীবী ছিলেন ড. শরীফ ভূঁইয়া। ইন্টারভেনার হিসেবে যুক্ত ছিলেন আইনজীবী এহসান এ সিদ্দিক। জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে শুনানি করেন শিশির মনির ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মোফাজ্জল হোসেনের পক্ষে এস এম শাহরিয়ার। বিএনপির পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জয়নুল আবেদীন ও ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল।
রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান এবং অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার অনীক আর হক। ইন্টারভেনর হিসেবে আদালতে বক্তব্য দেন ব্যারিস্টার এহসান আবদুল্লাহ সিদ্দিকী, ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদল, অ্যাডভোকেট মহসীন রশিদ ও ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবির।
এর আগে ২৭ আগস্ট আপিল বিভাগের রায় পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন শুনানি শেষে আপিলের অনুমতি দেওয়া হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করে ১৯৯৬ সালে ত্রয়োদশ সংশোধনী জাতীয় সংসদে গৃহীত হয়। এর বৈধতা নিয়ে ১৯৯৮ সালে হাইকোর্টে রিট দায়ের করা হয় এবং ২০০৪ সালের ৪ আগস্ট হাইকোর্ট সংশোধনীকে বৈধ ঘোষণা করে রিট খারিজ করে দেয়। পরবর্তী আপিলে ২০১১ সালের ১০ মে আপিল বিভাগ সংশোধনী বাতিল ঘোষণা করে।
পরে ওই রায়ের ভিত্তিতে পঞ্চদশ সংশোধনী পাস হয়, যা তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর ড. বদিউল আলম মজুমদার, তোফায়েল আহমেদ, এম হাফিজউদ্দিন খান, জোবাইরুল হক ভূঁইয়া ও জাহরা রহমান রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন করেন। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ারও পৃথকভাবে পুনর্বিবেচনার আবেদন করেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা মোফাজ্জল হোসেনও একই দাবি নিয়ে আবেদন করেছিলেন।
সকল পক্ষের যুক্তি বিবেচনা করে আজ সুপ্রিম কোর্ট ঘোষণা করল— তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা আবারও বৈধ। এই রায় বাংলাদেশের নির্বাচন ও সাংবিধানিক চর্চায় নতুন অধ্যায় সূচনা করল।


